তহবিল ব্যয় কমলেও ক্ষুদ্রঋণের সুদহার কমেনি

ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএফআই) সংগৃহীত তহবিলের প্রায় ২০ শতাংশই আসে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১২-১৪ শতাংশ সুদহারে তাদের নেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। সরকার ২০২০ সালের এপ্রিলে সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়ার পর থেকে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক থেকে ৮-৯ শতাংশ হারে তহবিল সংগ্রহ করতে পারছে। যদিও গ্রাহকের কাছ থেকে এনজিওগুলো এখনো ২৪ শতাংশ হারেই সুদ আদায় করছে।

এমএফআই প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল সংগ্রহের আরেকটি উৎস গ্রাহকের সঞ্চয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে গ্রাহকের সঞ্চয় ছিল প্রায় ৫৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, যা মোট তহবিলের প্রায় ৪৩ শতাংশ। গ্রাহকের এ অর্থের সুদ দিতে হয় মাত্র ৬ শতাংশ। অর্থাৎ স্বল্প সুদে গ্রাহকের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করলেও তা উচ্চহারে অন্য গ্রাহককে ঋণ হিসেবে দিচ্ছে এনজিওগুলো।

বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণের সুদহার কমে যাওয়ায় ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল সংগ্রহের খরচ চলতি অর্থবছর অনেকটাই কমে এসেছে। অন্যদিকে গ্রাহকের সঞ্চয়সহ অন্যান্য উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহের খরচ প্রকৃতপক্ষে কম থাকার পরও তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত সাধারণ গ্রাহক। গ্রাহকদের কাছ থেকে ক্ষুদ্রঋণের সুদহার কাগজে-কলমে ২৪ শতাংশ ধরা হলেও লুক্কায়িত ব্যয় যুক্ত করলে তা ৩০ শতাংশের নিচে নয়। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকঋণে সুদহার কমানোর সুফল পৌঁছাচ্ছে না।

ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যের সমন্বয় এবং দেশে ক্ষুদ্রঋণের প্রসার ও উন্নয়নে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরামের (সিডিএফ) তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছর এমএফআইগুলো ঋণ হিসেবে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার ৭০৭ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে সদস্যদের সঞ্চয় থেকে সংগ্রহ ছিল প্রায় ৪৩ শতাংশ বা প্রায় ৫৪ হাজার ২০৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এ ঋণের সুদহার ৬ শতাংশ। অর্থাৎ সংগৃহীত ঋণের অর্ধেকের বেশির সুদহার মাত্র ৬ শতাংশ। আবার সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন বা নেট উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা বা মোট ঋণের ২৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। রিভলভিং ফান্ড হিসেবে পরিচিত এ অর্থায়নের সুদহার শূন্যের কোটায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তহবিল সংগ্রহে এমএফআইয়ের গড় সুদহার ৬-৮ শতাংশের মধ্যেই রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন বা উদ্বৃত্ত তহবিলের হিসাব বাদ দিলে সুদহার সর্বোচ্চ ৭-১০ শতাংশ হতে পারে। ফলে তহবিল সংগ্রহ বা ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে গড় সুদহার ১০ শতাংশের নিচেই থাকবে। পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয় মেটানোর জন্য সুদহারের সঙ্গে গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বেশি হারে সুদ আদায় করতে পারে। ঋণ গ্রহণ ও প্রদানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর স্প্রেড ৪ শতাংশের নিচেই রয়েছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে ২৪ শতাংশের বেশি হারে সুদ আদায় করছে। ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের সুদহার কোনোভাবেই ১৫ শতাংশের বেশি হওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন তারা।

সিডিএফের তথ্যমতে, ঋণ বিতরণে এনজিওগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এমএফআই ঋণের ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ বিতরণ করেছে। মোট বিতরণকৃত ঋণের ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ আশার, ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ ব্যুরো বাংলাদেশ ও ৩ দশমিক ১২ শতাংশ টিএমএসএসের। এছাড়া মোট ঋণের এসএসএস ২ দশমিক ১১ শতাংশ, সাজেদা ফাউন্ডেশন ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ, জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ, পিএমইউকে ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ, উদ্দীপন ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ ও শক্তি ফাউন্ডেশন শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ বিতরণ করেছে।

এ বিষয়ে আশার গভর্নিং বডির সদস্য ও আশা ইন্টারন্যাশনালের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মো. এনামুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ভারতের পরই ক্ষুদ্রঋণে সুদহারে দ্বিতীয় সর্বনিম্নে রয়েছে বাংলাদেশ। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সুদহার যেটা বলে, প্রকৃতপক্ষে তার চেয়ে ৩-৪ শতাংশ বেশি। ব্যাংকের ৫০ কোটি টাকা পরিচালনার জন্য একজন কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকলেই হয়। কিন্তু আমাদের ন্যূনতম ১০০ জন নিয়োজিত রাখতে হয়। কেননা একজন ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহক একদিন এসে টাকা তুলে নিয়ে গেলেও তার কাছে কমপক্ষে ৫০ বার যেতে হয়। পাশাপাশি সুপারভাইজরি ও পরামর্শক ব্যয় রয়েছে। সব মিলিয়ে আমাদের পোর্টফোলিও হার ১৮-২০ শতাংশের নিচে থাকে না। এর সঙ্গে অন্যান্য খরচ যুক্ত করলে এমএফআইগুলোর সার্ভিস চার্জ ২৪ শতাংশের নিচে যাওয়ার সুযোগ খুব কম। সম্প্রতি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সুদহার কমেছে বলা হচ্ছে। যার সুফল এখনো এমএফআই পায়নি। যদিও এর মধ্যে করোনা পরিস্থিতিতে ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈদেশিক সাহায্য কমে যাওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকিতে রয়েছে।

সিডিএফের তথ্যমতে, বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মোট অর্থায়নের ১৬ দশমিক ১৬ শতাংশ বা প্রায় ২০ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এ ঋণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে একসময় ১২-১৪ শতাংশ হারে সুদ পরিশোধ করেছে এমএফআই প্রতিষ্ঠানগুলো। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে সেই সুদহার নেমে এসেছে ৮-৯ শতাংশে। এর মধ্যে কৃষি খাতের জন্য ৮ শতাংশ হারে ঋণ পাচ্ছে তারা। অন্যদিকে অকৃষি খাতের জন্য ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মাত্র ৮-৯ শতাংশ হারে ঋণ সংগ্রহ করছে। অর্থাৎ তাদের ঋণ সংগ্রহের ব্যয় চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমেছে। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন নেয়ার ক্ষেত্রে সুদহার কমলেও গ্রাহকরা আগের হারেই সুদ পরিশোধ করছেন।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ

এইচ এম সোহেল॥ আবারো বরিশাল-বানারীপাড়া সড়কে পাথরবোঝাই ট্রাকের ভারে ভেঙ্গে পড়েছে মাধবপাশার বেইলি ব্রিজ। পাথর বোঝাই ট্রাকটি ব্রিজ পারাপররের সময় ব্রিজের মাঝামাঝি আসার পরে ব্রিজটি ভেঙ্গে ট্রাকটি খালের ভিতরে পড়ে যায়। এতে ভোগান্তিতে পরে দুই পারের হাজারো গাড়ি এবং যাত্রী। ঘটনাটি ঘটে বুধবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ভোর ৭ টার দিকে। বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা ইউনিয়ন পরিষদসংলগ্ন বরিশাল-বানারীপাড়া সড়কে এই বেইল ব্রিজটি খালে ভেঙ্গে পড়ে। পাথরবোঝাই একটি ট্রাকটি পিরোজপুর থেকে বানারীপাড়া আসার পথে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। এর আগে ২০২০ সালেও পাথরবোঝাই ট্রাকের ভারে ভেঙ্গে পড়েছিলো বেইলি ব্রিজটি। সড়ক ও জনপথ বিভাগ ইউনিয়ন পরিষদসংলগ্ন খালের ওপর ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজের সংস্কারের কাজ শুরু করেছিলো। ওই সময় সড়কের পাশে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে বেইলি ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছিল। বরিশাল মেট্রোপলিটনের বিমান বন্দর থানার এ এস আই সুমন দেশ জনপদকে জানান, আমি সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে আশি। বেইলি ব্রিজটি ভেঙে পড়ায় বরিশালের সঙ্গে নেসারাবাদ ও বানারীপাড়ার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে । এতে স্থানীয় জনসাধারণ ও যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ সৃস্টি হয়েছ। ট্রাক উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে। মাধবপাশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এই ব্রিজটি বছর দেড়েক আগে আরও একবার ভেঙ্গে পড়েছিল। দুর্ঘটনায় স্থানীয়রা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্রুত ব্রিজটি সচল করার দাবি জানান তিনি।